বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অবদান

স্বাধীন বাংলা বেতার বাঙালি। জাতির মুক্তিসংগ্রামের সারথি হিসেবে মুক্তিযােদ্ধাদের পাশাপাশি অবরুদ্ধ দেশবাসীকে মুক্তি প্রেরণায় উদ্দীপ্ত করেছিল। নিম্নে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে এর অবদান আলােচনা করা হলাে : ১. উজ্জীবিতকরণ : মুক্তিযুদ্ধের সহযােগী, সমর্থনকারী, শরণার্থী সবাইকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র দারুণভাবে। উজ্জীবিত রাখে। শুধু তাই নয়, সাড়ে সাত কোটি বাঙালির মনােবল অক্ষুন্ন রাখতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দ। সৈনিকেরা কাজ করে। ২. ঘােষণা ও কর্মসূচি প্রচার : মুক্তিযুদ্ধের যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘােষণা ও কর্মসূচি প্রচারের ক্ষেত্রে স্বাধীন বাংলা বেতার ।

কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই কেন্দ্র থেকে যেসকল ঘােষণা ও কর্মসূচি প্রচার করা হয় তা নিম্নে উল্লেখ করা হলাে : (ক) স্বাধীনতার ঘােষণা পাঠ : স্বাধীনতার ঘােষণার প্রথম নিদর্শন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণ ।। এছাড়া ২৭ মার্চ এ মেজর জিয়াউর রহমানের ভাষণ বারবার প্রচার করা হতাে। এমনি ঘােষণায় দিশেহারা সাড়ে সাত । কোটি বাঙালি উঠে দাঁড়ায় গভীর আত্মবিশ্বাসে। (খ) সংবাদ কণিকা ও গান প্রচার : দৈনিক সকাল ৭টা ও সন্ধ্যা ৭টা এ দুই অধিবেশনে শুরু হয় অনুষ্ঠান। এতে থাকে, বাংলা ও ইংরেজি খবর, বিশেষ কথিকা, বঙ্গবন্ধুর বাণী এবং দেশাত্মবােধক গানের অনুষ্ঠান জাগরণী ।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রচারিত সংবাদ, দেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধরত মুক্তিযােদ্ধাদের যেমন বিভিন্ন সংবাদ প্রদান করে সহায়তা। করেছে, তেমনি তা বিশ্ব জনমত গঠনেও ভূমিকা রেখেছে। (গ) চরমপত্র প্রচার : এসময় মুক্তিযােদ্ধাদের জন্য বিশেষ অনুষ্ঠান ‘অগ্নিশিখা’ ও ‘চরমপত্র’ প্রচার করা হতাে। চরমপত্র লিখতেন এবং পড়তেন এম.আর. আখতার মুকুল। অগ্নিশিখা’ মুক্তিবাহিনীর জন্য বিশেষ অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল।

মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এম. আর. আখতার মুকুল কর্তৃক প্রচারিত চরমপত্র এর প্রতিটি অনুষ্ঠান যেন এক একটি পারমাণবিক বােমার কাজ করেছে। | (ঘ) বিশেষ অনুষ্ঠান পরিচালনা : জুলাই ১৯৭১-এর মধ্যে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে প্রচারিত ‘জল্লাদের দরবার’ ইয়াহিয়া খান ও তার সভাসদবৃন্দের চরিত্র চিত্রণ করে বিশেষ ব্যঙ্গনাটিকা, দৃষ্টিপাত, বিশেষ পর্যালােচনা; ইসলামের দৃষ্টিতে, বিশেষ কথিকা এবং রাজনৈতিক মঞ্চ ও পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে বিশেষ পর্যালােচনা উল্লেখযােগ্য। এসকল। অনুষ্ঠানও বাঙালিদেরকে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তােলে।

নেতাদের বাণী : স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের নিয়মিত অনুষ্ঠান সিরিজের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল। প্রতিনিধির কণ্ঠ। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, । অর্থমন্ত্রী এম. মনসুর আলী, মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি কর্নেল আতাউল গণি ওসমানী ও সমসাময়িক অনেক নেতৃবৃন্দ । বুদ্ধিজীবীগণ কর্তৃক জাতির উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণ এবং বাণী সাড়ে সাত কোটি বাঙালির মনে সঞ্চার করেছিল আশার আলাে।

ছাত্রদের ভাষণ ও কথিকা প্রচার : বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ছাত্রদের ভূমিকা ছিল অনন্য। ছাত্রনেতাদের ভাষণ ও কথিকা প্রচারের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এদেশের তরুণ সমাজকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে। পড়তে উদ্দীপ্ত করেছিল। ৩. এক একটি বুলেট : বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত। গুরুত্বপূর্ণ। এই বেতারের শব্দ সৈনিকগণ সাড়ে সাত কোটি মুক্তিকামী বাঙালির মনােবল অক্ষুন্ন রাখার জন্য দিবারাত্রি কাজ। করেছেন। এই বেতার কেন্দ্রের এক একটি শব্দ ইথার ভেদ করে বেরিয়ে এসেছে এক একটি বুলেট হয়ে। যার আঘাতে পশ্চিমা দখলদার বাহিনী এবং এদেশের স্বাধীনতা বিরােধী চক্র ১৯৭১ সালে মেরুদণ্ড শক্ত করে দাঁড়াতে পারে নি ।

অনুপ্রেরণার উৎস : বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইউনিটগুলাে এবং শক্রকবলিত এলাকার সাথে যােগসুত্র বজায় রেখেছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। এই বেতার কেন্দ্র দীর্ঘ নয় মাস ধরে অমিততেজ ও তেজস্বিনী ভাষা আর দপ্তকণ্ঠে। বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রচারের মাধ্যমে বাংলার আপামর জনগণ ও এর অতন্দ্র প্রহরী মুক্তিযােদ্ধাদের সার্বক্ষণিক অনুপ্রেরণা দিয়ে। শক্তি দিয়ে, সাহস দিয়ে, দিশেহারা মুক্তিকামী বাঙালিকে বিজয়ের সিংহদ্বারে পৌছে দিয়েছে।

বাংলাদেশের খবর বিদেশে প্রচার : মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সাথে সাথে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা বিদেশি সাংবাদিকদের আটক করে। ফলে বাংলাদেশের খবর বিদেশে প্রচার প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এমনি পরিস্থিতিতে স্বাধীন বাংলা। বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে সীমিত আকারে হলেও তৎকালীন বাংলাদেশের অবস্থা বিশ্ববাসী কমবেশি জানতে পারে। | ৬, ১২নং সেক্টর হিসেবে কাজ করা : মুক্তিযুদ্ধে ১১টি সেক্টরে যুদ্ধ পরিচালিত হয়। কিন্তু স্বাধীন বাংলা। বেতার যেভাবে মানুষকে আশান্বিত ও উজ্জীবিত করেছিল তা অভূতপূর্ব। তাই স্বাধীন বাংলা বেতারকে যদি মুক্তিযুদ্ধের ১২ নং সেক্টর বলা হয় তাহলে সত্যের অপলাপ হবে না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *