বাংলাদেশের স্বাধীনতা সম্পর্কে বিস্তারিত ঘটনা আলোচনা করা হলো। অজানা নানান তথ্য জেনে নিন

বাংলার মুক্তিবাহিনী ও ভারতের সেনাবাহিনীর যৌথ আক্রমণে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী চরম সংকটে পতিত হয়। ৭ ডিসেম্বর যশাের ক্যান্টনমেন্টের পতন ঘটে ও সিলেট শহরটিও যৌথ। বাহিনীর দখলে আসে। এরপর একের পর এক অঞ্চল যৌথ বাহিনীর দখলে আসতে থাকে। ১১ ডিসেম্বরের মধ্যে। পাকবাহিনীর সমস্ত প্রতিরােধ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। ১৪ ডিসেম্বর যৌথ বাহিনী ঢাকার মাত্র ১৫ কিলােমিটার দূরে থেকে। পাকিস্তানি বাহিনীর সর্বশেষ ও প্রধান ঘাঁটি ঢাকা অবরােধ করে। ঐদিন সকাল থেকেই নিয়াজী সব আশা ছেড়ে দিয়ে। পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ প্রস্তাব নিয়ে বিভিন্ন বিদেশি দূতাবাসের সাথে আলাপ-আলােচনা আরম্ভ করেন।

পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণে প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন : বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের চূড়ান্ত। পরিণতিতে পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণে বাংলাদেশের পক্ষে ভারত প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করে।  ডিসেম্বর সকাল দশটায় পাকিস্তানি ১৪ ডিভিশন কমান্ডার মেজর জেনারেল জামশেদ ঢাকার মিরপুর ব্রিজের কাছে ভারতীয় জেনারেল নাগরার কাছে আত্মসমর্পণ করেন। ভারতীয় মিত্রবাহিনী ১০-৪০ মিনিটে ঢাকা নগরীতে প্রবেশ করেন। এরপর বিকেল ৪-২১ মিনিটে পাক হানাদার বাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের অধিনায়ক লে. জেনারেল এ. কে. নিয়াজী ৯৩ হাজার সহযােগী সৈন্য নিয়ে অস্ত্রশস্ত্রসহ ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সােহরাওয়ার্দী উদ্যান) বাংলাদেশ ও ভারতের সম্মিলিত মিত্র ও মুক্তিবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান সেনাপতি লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরােরার কাছে আত্মসমর্পণ করেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সম্পর্কে বিস্তারিত ঘটনা

এভাবে দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধের পরিসমাপ্তি হয় এবং বিশ্বের বুকে জন্ম নেয় নতুন স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ’। পরিশেষে বলা যায় যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারত অনন্য ভূমিকা পালন করে। প্রত্যক্ষ ও পরােক্ষ সাহায্য-সহযােগিতা দান ছাড়াও শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণে ভারত মধ্যস্থতা করে। এতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের সাথে ভারতের সহযােগিতার কথাও ইতিহাসে স্থান পায়।।

মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর জীবন রক্ষায় ভারত অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত এবং এ প্রসঙ্গে ভারতের অবদান অনন্য ও অপরিসীম। মুক্তিযুদ্ধে ভারত সরকার ও বিরােধী দলসমূহ সর্বতােভাবে সহায়তা করেছে। একই সাথে ভারতীয় সরকার ও জনমত বঙ্গবন্ধুর প্রহসনের বিচার বন্ধ ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিরুদ্ধে বিভিন্ন কার্যক্রম ও প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে। মুক্তিযুদ্ধে ইন্দিরা গান্ধী/ভারতের ভূমিকা : বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ইন্দিরা গান্ধী/ভারতের ভূমিকা নিম্নে আলােচনা করা হলাে : সীমান্ত এলাকায় মুক্তিযােদ্ধা নির্বাচন করে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য অসংখ্য – যুবশিবির গড়ে উঠে। এসব যুবশিবিরে প্রথাগত যুদ্ধ এবং গেরিলা যুদ্ধ উভয় প্রকার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। s সর্বত্র শিবির স্থাপন : পশ্চিম বাংলা, আসাম, বিহার, মেঘালয় এবং ত্রিপুরার রাজ্য সরকার অসংখ্য অভ্যর্থনা কেন্দ এবং শরণার্থী শিবির সীমান্ত এলাকায় গড়ে তােলে। ইতােপূর্বে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ২৭ মার্চ ভারতীয় লােকসভায়। বাঙালি জাতির সংগ্রামের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন। আতঙ্কগ্রস্ত বাঙালি জনগণ যেন সীমান্ত অতিক্রম করে এসব নিরাপদ শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় গ্রহণ করতে পারে সেজন্য ভারতীয় বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বি.এস.এফ.) ভারতবাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দেয়।।

মুক্তিযােদ্ধাদের প্রশিক্ষণ প্রদান : দেশকে স্বাধীন করার জন্য আত্মােৎসর্গ ও সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত হাজার হাজার স্বাস্থ্যবান যুবক মুক্তিবাহিনীতে যােগদান করে। এসব যুবককে চূড়ান্ত যুদ্ধের জন্য শারীরিক ব্যায়ামসহ অস্বশিক্ষা ও যুদ্ধবিদ্যায় প্রশিক্ষণ দিয়ে রণকৌশল ও অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহারে পারদর্শী করে তােলা হয়। উপরন্ত পাঁচটি রাজ্যে অনেক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তােলা হয়। ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণগণ প্রশিক্ষণ প্রদান করেন।। ৪. বাংলাদেশ বাহিনীর সদর দপ্তর স্থাপন : মে মাসে কলকাতায় ৮ নম্বর থিয়েটার রােডে বাংলাদেশ | বাহিনীর সদর দপ্তর স্থাপিত হয়। ৫. বাঙালিদের সংগ্রামের প্রতি পূর্ণ সমর্থন : ইতােপূর্বে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ২৭ মার্চ ভারতীয় লােকসভায়। বাঙালি জাতির সংগ্রামের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন। ৬. সীমান্ত খুলে দেওয়া : আতঙ্কগ্রস্ত বাঙালি জনগণ যাতে নির্বিঘ্নে সীমান্ত অতিক্রম করে বিভিন্ন নিরাপদ শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় গ্রহণ করতে পারে সেজন্য ভারতীয় বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বি.এস.এফ) ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দেয়।

মুক্তিবাহিনী যখন প্রবল উদ্যমে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল, তখন মুজিববাহিনী নামে অপর এক। বাহিনী গড়ে উঠে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর গেরিলা যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ওবানের নেতৃত্বে এবং ভারতীয় সরকারের কেবিনেট ডিবিশনের অধীনস্থ রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (র)-এর অনুমােদনক্রমে মুক্তিবাহিনী সংগঠিত করা। হয়। শেখ ফজলুল হক মণি, তােফায়েল আহমদ, আব্দুর রাজ্জাক ও সিরাজুল আলম খান এ বাহিনীর নেতৃত্ব দান করেন। | ৮. সেক্টরে বিভক্তকরণ : ভারতীয় সেনাবাহিনী মুক্তিবাহিনীকে সহায়তা করার জন্য ছয়টি সেক্টর প্রতিষ্ঠা করে। পশ্চিম বাংলার মূর্তি ক্যাম্পে আলাফা সেক্টর, পশ্চিম বাংলার রামগঞ্জে ব্রেভাে সেক্টর, বিহারের চাকুলিয়ায় চার্লি সেক্টর, ত্রিপুরার দেউতারায় ডেলটা সেক্টর, আসামের মাসিমপুরে ইকো সেক্টর এবং মেঘালয়ের তুরায় যক্সট্রট সেক্টর প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব সেক্টরের অধিনায়কত্ব করেন যথাক্রমে-বিগ্রেডিয়ার বি. সি. জোশী, বিগ্রেডিয়ার প্রেম সিং, ব্রিগেডিয়ার এন.এ. সালিক, বিগ্রেডিয়ার সাবেক সিং, বিগ্রেডিয়ার এম. বি ওবাদ ও বিগ্রেডিয়ার সান্তসিং।

বঙ্গবন্ধুর জীবন রক্ষায় ইন্দিরা গান্ধী/ ভারতের ভূমিকা : ভারতীয় সরকার, সংসদ, বিরােধী দল, বিভিন্ন। সরকারি-বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থা, প্রচারমাধ্যম ও জনগণ বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দাবি করে, জনমত গঠন করে ও বিশ্ব। সম্প্রদায়কে এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানায়। জুন মাসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিং ওয়াশিংটন ন্যাশনাল প্রেসক্লাবে। মুজিবের মুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পাকিস্তানের উপর চাপ সৃষ্টির আহবান জানান। তিনি জাতিসংঘের মহাসচিবকে দেওয়া পত্রে ‘মুজিবের খারাপ কিছু হলে বিপজ্জনক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেন। বিরােধী দল বঙ্গবন্ধুর বিচার ঠেকাতে দ্রুত বাংলাদেশকে স্বীকৃতির আহ্বান জানায়। কলকাতায় সাহিত্য, সংস্কৃতি, বুদ্ধিজীবী। প্রভৃতি সংস্থা বঙ্গবন্ধুর মুক্তির মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের উপায় হিসেবে ব্যক্ত করে। লােকসভায় বঙ্গবন্ধুর জীবন রক্ষার্থে সরকারকে আরাে উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণের দাবি জানানাে হয়।

আগস্ট এজন্য ভারতব্যাপী। মুজিবনগর দিবস’ পালিত হয়। ১১ আগস্ট স্টেটম্যান পত্রিকা বঙ্গবন্ধুর গােপন বিচার সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত পরিবেশন করে। রাজ্যসভা ও লােকসভার বিরােধী দলীয় সদস্যরা বঙ্গবন্ধু প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র, পকিস্তান ও জাতিসংঘের সাথে। আরাে কঠোর ও দৃঢ় অবস্থান না নেওয়ায় সরকারের সমালােচনা করেন। | ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী শেখ মুজিবের জীবন রক্ষায় এগিয়ে আসতে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রের কাছে চিঠি লেখেন। তিনি ১০ আগস্ট বিশ্বের ২৪টি দেশের প্রধানদের কাছে বঙ্গবন্ধুর প্রহসনমূলক বিচার বন্ধু ও তার জীবন। রক্ষায় পাক প্রেসিডেন্টের কাছে প্রভাব বিস্তারের আহ্বান জানান। সেপ্টেম্বরে বিভিন্ন দেশ সফরকালেও তিনি তার বিচার বন্ধ ও মুক্তির জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলােকে প্রভাব বিস্তারের আহ্বান জানান। উপসংহার : উপরিউক্ত আলােচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের রূপকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন রক্ষায় ইন্দিরা গান্ধী তথা ভারত সরকার কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের সামরিক উপদেষ্টা কিসিঞ্জার মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযােগিতা প্রত্যাহারের অনুরােধ জানালে মিসেস। গান্ধী তা প্রত্যাখ্যান করেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী নিজেই বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক যুদ্ধে নামেন। তিনি যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, বেলজিয়ামসহ ৮টি দেশ সফর করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে এবং বঙ্গবন্ধুর বিচার বন্ধে। বিশ্ব জনমতকে প্রভাব বিস্তারের আহ্বান জানান।  বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে চীনের ভূমিকা উল্লেখ কর। অথবা, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে চীনের ভূমিকা বর্ণনা কর। উত্তর : ভূমিকা : মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরই চীন সরকার কট্টর পাকিস্তানঘেঁষা নীতি অনুসরণ করে। যা স্বাধীনতা প্রিয় বাঙালি বিশেষ করে বামপন্থিদের জন্য গভীর হতাশা সৃষ্টি করে। চীন, সােভিয়েত সম্পর্কের কারণে বেইজিং তার দ্বৈত বিপ্লবী রণকৌশল প্রয়ােগ করে।

পাকিস্তানের মতাে একটি মিত্রদেশ দুর্বল বা ক্ষুব্ধ হােক তা চীন চায় নি। আবার চীন এও। চায় নি যে, উভয়ের বৈরি দেশ ভারত সামরিক হস্তক্ষেপ করে বাংলাদেশ সংকট নিরসনে উৎসাহিত হােক। | বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে চীনের ভূমিকা : মুক্তিযুদ্ধে চীনা নীতিকে ২ ভাগে ভাগ করা যায়। ১ম পর্যায় হচেছ। চীন ভারত ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মন্তব্য ও হুমকি প্রদান করে এবং পাকিস্তানঘেষা নীতি অনুসরণ করে। ২য় পর্যায়ে। চীন সরাসরি বাংলাদেশ বিরােধী ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে চীনের ভূমিকা নিম্নে উল্লেখ করা হলাে : ১. চীনের প্রাথমিক মৌনতা : ২৫ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যার পর চীন ১৫ দিন এ সম্পর্কে কোনাে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে নি। এমনকি মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গেও চীন কোনাে মন্তব্য করে নি। এ সময় চীনের আলােচনা-সমালোচনার পাত্র ছিল ভারত ও রাশিয়া।

Masud

আমি মাসুদ রানা। Studytimebd.com একটি শিক্ষামূলক ওয়েবসাইট। আমি এখানে সকল শিক্ষামূলক তথ্য প্রকাশ করে থাকি। এই ওয়েবসাইটে যে বিষয় গুলো নিয়ে আলোচনা করা হয় তার মাঝে প্রধান ক্যাটেগরি গুলো হলো লেখাপড়া, পরীক্ষার প্রস্তুতি, বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থা এবং বাংলাদেশের সংস্কৃতি।

View all posts by Masud →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *