দুই বাংলার মধ্যে যে ধরণের সম্পর্ক অটুট ছিলো

ভ্রাতসুলভ সৌহার্দ বা সামাজিক বন্ধন সৃষ্টির পর আর অটুট ছিল না। সামাজিক পরিবেশ পাকিস্তানের উভয় অংশে ছিল বিরূপ। ক্ষমতাসীন শাসকগােষ্ঠী সব সুযােগ-সুবিধা ভােগ করতাে। ফলে। বাঙালিরা নিজের স্বাধীন আবাসভূমির চিন্তা করে পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটায়।। | ৬. সাংস্কৃতিক কারণ : পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে একমাত্র ধর্ম ছাড়া পূর্ব পাকিস্তানের সংস্কৃতি, কৃষ্টি, ভাষা। এভতির কিছুই মিল ছিল না।

শাসকবর্গ শুরুতেই উর্দুকেই দেশের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করতে চেয়েছিল। তাই সর্বাগ্রেই। ভাষার প্রশ্নে যে মরণপণ আন্দোলন শুরু হয় (১৯৫২) তারই পথ ধরে বাংলাদেশ স্বাধীনতার দিকে অগ্রসর হয়। দুর্বার আন্দোলনের কাছে পাকগােষ্ঠী বারবার পরাজিত হয়।। ৭. মনস্তাত্ত্বিক কারণ : পাকবাহিনী দীর্ঘকাল যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। তারা এক প্রকার পরদেশে অবস্থান করে নিজেদের। পরিবার, আত্মীয়-পরিজন থেকে দূরে ছিল। বন্দী বা ধুত সৈন্যদের সম্পর্কে নানা লােমহর্ষক কাহিনী ছড়িয়ে পড়ে। এতে তাদের নৈতিক মনােবল হারিয়ে যায়। মেজর সিদ্দিক সালিক বলেন, “তাদের প্রশিক্ষণের সময়, সমর উপকরণ ও নৈতিক মনােবল ছিল নিম্নস্তরের। সবচেয়ে খারাপটি হলাে, অপারেশনে যাবার ব্যাপারে তাদের অনেকেরই মনের দিক থেকে সায় । ছিল না।” সুতরাং মনস্তাত্ত্বিক পশ্চাৎপদতা পাকবাহিনীর পরাজয়ের ও বাঙালিদের বিজয়ের অন্যতম কারণ।

মুক্তিযােদ্ধাদের অন্যতম রণকৌশল ছিল গেরিলা পদ্ধতি

গেরিলা যুদ্ধ : মুক্তিযােদ্ধাদের অন্যতম রণকৌশল ছিল গেরিলা পদ্ধতি। এতে পাকবাহিনীকে সহজেই বিপদে। ফেলে গেরিলারা নিরাপদে চলে যেতে পারত। গেরিলা আক্রমণ জোরদার হওয়ায় পাকবাহিনী দিশেহারা হয়ে পড়ে। ৯. ভারতের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ : মুক্তিযুদ্ধে ভারত সরাসরি জড়িয়ে পড়ে। শক্তিশালী ভারতীয় বাহিনীর কাছে পাকিস্তান টিকতে পারে নি। পাকবাহিনীর পূর্ব রণাঙ্গনে ১.২০ লাখ সৈন্যের বিপরীতে ভারত নিয়ােগ করে ১.৯৫ লাখ সৈন্য। এছাড়া, লক্ষাধিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযােদ্ধা ও তার চেয়েও বেশি স্বেচ্ছাসেবক যুদ্ধে লিপ্ত হয়। অধিকন্তু, ভারতের নৌ ও বিমান বাহিনীর তুলনায় পাক সমরবল ছিল নিতান্তই অপ্রতুল। তাই তারা পর্যদস্ত হয়। ।

পাকিস্তানের অর্থ সংকট : পাকিস্তান যুদ্ধকালে প্রচণ্ড অর্থ সংকটে পড়ে। বৈদেশিক সাহায্য ও বিশ্ব ব্যাংক। থেকে অনুদান বন্ধ, রপ্তানি হ্রাস পাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রায় অস্ত্র কেনার পথ বন্ধ হওয়া প্রভৃতি কারণে যুদ্ধ পরিচালনায় তারা হিমশিম খায়। উপরন্তু, যুদ্ধ চালনায় প্রতিদিন ১ কোটি টাকা ব্যয় হতে থাকে। এমতাবস্থায় পাকিস্তানকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও আরবের ক’টি দেশ থেকে গােপনে সাহায্যের উপর নির্ভরশীল হতে হয়।। ১১. পাকবাহিনীর গণহত্যা ও নারী নির্যাতন : ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাত থেকে পাকবাহিনী। ব্যাপক গণহত্যা শুরু করে। সে সাথে তারা নারী নির্যাতন, অপহরণ, ধর্ষণ প্রভৃতি ঘৃণিত কর্মকাণ্ড করে। ফলে তারা। জনসমর্থন হারায়। এমনকি এসবের দরুন বহির্বিশ্বে ।

তাদের ভাবমূর্তি বিনষ্ট হয়। মুক্তিযােদ্ধরা তাদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরােধ গড়ে তােলে। জনসমর্থনহীন যােদ্ধারা বেশিদিন টিকতে পারে নি। ১২. বিশ্ব জনমত : বাংলাদেশের স্বাধীনতার সপক্ষে ও পাকিস্তানি নির্মমতার বিপক্ষে বিশ্ব জনমত পতিফলিত । হয়। ফলে বাংলাদেশের মুক্তিযােদ্ধাদের বিজয় ও হানাদার পাকবাহিনীর পরাজয় ত্বরান্বিত হয়। ১৩. শক্তিমত্তায় দুর্বলতা : বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে শক্তিমত্তায় পাকিস্তান যৌথ বাহিনীর (বাংলাদেশ-ভারত) তুলনায় বেশ পিছিয়ে ছিল। মুক্তিযােদ্ধাদের সাথে ভারতের বিপুল সৈন্য সংযুক্ত হয়। তাছাড়া, ভারতের। রণকৌশল পাকিস্তানের চেয়ে উন্নত ছিল। উপরন্ত, পাকিস্তানকে পশ্চিম রণাঙ্গনে বিপুল শক্তি সমাবেশ করতে হয়। তাই ।

পূর্ব রণাঙ্গনে শক্তিমত্তায় দুর্বল ছিল

তারা পূর্ব রণাঙ্গনে শক্তিমত্তায় দুর্বল ছিল। ভারতীয় ৮ ডিভিশন ও ১ ব্রিগেড় সৈন্য ও ১০ স্কোয়াড্রন বিমান শক্তির বিপরীতে পাকিস্তানের ছিল ৩ ডিভিশন ও ১ ব্রিগেড সৈন্য ও ১ স্কোয়াড্রন বিমান শক্তি। নৌশক্তিতে পাকিস্তান কার্যত ছিল জবাবহীন ।। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ৭ম নৌবহরে পাকিস্তানের নির্ভরতা তাও শেষ পর্যন্ত না আসায় তাদের মনােবল একেবারেই ভেঙে । যায়। মাত্র ১৩ দিনের মধ্যেই পাকবাহিনী পর্যুদস্ত হয়ে আত্মসমর্পণ করে। । ১৪. গণযুদ্ধ : মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাংলাদেশের গণযুদ্ধ। তাই আমজনতা এতে সমর্থন দেয়। পক্ষান্তরে, এটি ছিল।

পাকিস্তানের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ। তাই সীমিত সংখ্যক রাজাকার, আল-বদর, অবাঙালি বিহারীদের দিয়ে সমর্থন আদায়। সম্ভব হয় নি। প্রবল দেশপ্রেম, অপার আন্তরিকতা ও একাগ্রতা নিয়ে বাঙালি লড়ে যায় ও জয় সুনিশ্চিত করে। পক্ষান্তরে, পাকিস্তানের পক্ষে সেভাবে লড়াই করা সম্ভব না হওয়ায় পরাজয় অত্যাসন্ন হয়ে পড়ে। | উপসংহার : উপরিউক্ত আলােচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, একক কোনাে কারণে নয়; মূলত বিভিন্ন কারণে। বাঙালির বিজয় এবং পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয় ঘটে। বস্তুত বীর বাঙালির বিজয়ের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল তাদের। একাগ্র দেশপ্রেম। বাঙালি জাতি প্রবল দেশপ্রেম, আন্তরিকতা ও একাগ্রতার মাধ্যমে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে যুদ্ধ করে। অন্যদিকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ধ্বংসযজ্ঞ, নৃশংসতা, পাশবিকতাকে আশ্রয় করে লক্ষ্যহীন যুদ্ধে লিপ্ত হয়। তাদের সহযােগী বিভিন্ন বাহিনী মুখে দেশপ্রেম তথা পাকিস্তান রক্ষার কথা বললেও তাদের মূল লক্ষ্য ছিল লুটপাট, নিজেদের । ভাগ্যোন্নয়ন। প্রকৃতপক্ষে, এই নৈতিকতাবর্জিত, দেশপ্রেমহীন বাহিনীর দ্বারা যুদ্ধে জয় ছিল অসম্ভব।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *