দৈনিক পত্রিকায় সােভিয়েত ইউনিয়নের প্রচার মাধ্যমের ভূমিকা

৩. সােভিয়েত ইউনিয়নের প্রচার মাধ্যমের ভূমিকা : সােভিয়েত ইউনিয়নের দৈনিক পত্রিকা প্রাদভা’তে। বাংলাদেশে গণহত্যা এবং বাংলাদেশ থেকে ৯০ লক্ষ শরণার্থীর ভারতে আশ্রয় গ্রহণের মর্মান্তিক চিত্র তুলে ধরে লেখে, পাকিস্তানি শাসকবর্গ তাদের এ হীন কার্যকলাপ ঢাকার জন্যই ভারত আক্রমণের জিগির তুলেছে। কারণ পাকিস্তানের। উদ্দেশ্য ছিল এভাবে বিশ্বকে ধােকা দেওয়া যায় কিনা। আসলে ব্যাপারটা ভারত-পাকিস্তান বিরােধ। এ ধরনের পাগলামি। এবং উন্মাদনার বিরুদ্ধে প্রাভদা’ পাকিস্তানের কঠোরভাবে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে। ১ অক্টোবর ১৯৭১, সােভিয়েত বার্তা সংস্থা ‘তাস’ সর্বপ্রথম প্রকাশ করে তার নিজস্ব এক প্রতিবেদন। এ প্রতিবেদনে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হত্যা, ধ্বংস, নির্যাতন। ও শরণার্থী সম্পর্কে সমালােচনা করা হয়। । ৪. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রচার মাধ্যমের ভূমিকা : মার্কিন সংবাদপত্র, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ এমনকি অনেক আমলা বাঙালিদের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল। বিশেষ করে ‘নিউইয়র্ক টাইমস’, ওয়াশিংটন পোেস্ট। ‘ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মর্টিনর’ প্রভৃতি সংবাদপত্র বাংলাদেশের ঘটনাবলি সম্পর্কে বিস্তারিত সংবাদ তথ্য পরিবেশন করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই নিউইয়র্ক টাইমস মন্তব্য করেছিল, “এই গৃহযুদ্ধ পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার হলেও গেরিলা যুদ্ধের রূপ পরিগ্রহ করলে বিপদমূলক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বের রাষ্ট্রবর্গের উচিত তারা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে আহ্বান জানাবে যেন মানবতা ও শুভবুদ্ধির ভিত্তিতে তিনি রক্তপাত বন্ধ করেন এবং জনগণের নির্বাচিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেন।” ওয়াশিংটন পােস্ট এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে স্বদেশের নাগরিক হত্যার জন্য ইয়াহিয়াকে দায়ী করে।। ৫. ব্রিটেনের প্রচার মাধ্যমের ভূমিকা : ৩০ মার্চ তারিখের ‘দি ডেইলি টেলিগ্রাফ’ –এর লিড স্টোরিতে। ঢাকার বিস্তারিত খবর সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটির সংবাদদাতা সাইমন ড্রিংগ ২৫ মার্চ রাত্রে অন্যান্য বিদেশি সাংবাদিকদের সাথে হােটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ছিলেন। বিদেশি সাংবাদিকদের যখন বহিষ্কার করা হয় তিনি তখন হােটেলের ছাদে লুকিয়ে ছিলেন। পরে সুযােগ মতাে বের হয়ে সারা শহর ঘুরে হত্যা ও ধ্বংসলীলা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেন এবং ২০ রােল ছবি তােলেন। ১৩ জুন লন্ডনে বহুল প্রচারিত ও প্রভাবশালী দি সানডে টাইমস পত্রিকায়। পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হত্যাযজ্ঞ সম্পর্কে এক বিস্তারিত রিপাের্ট প্রকাশিত হয়। এ সকল চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী রিপাের্ট বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদপত্র, টিভি, রেডিওর মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। এর ফলে পাকিস্তান কর্তক। পূর্ববঙ্গে গণহত্যা সম্পর্কিত সংবাদ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ১ আগস্ট বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে লন্ডনের ট্রাফালগার স্কোয়ারে যে গণসমাবেশের আয়ােজন করা হয় সে সম্পর্কে জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য বিভিন্ন পত্রিকায়। ২৯ জুলাই অগ্রিম সংবাদ পরিবেশিত হয়। পাকিস্তানের অত্যাচারী সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং স্বাধীন ও । সার্বভৌম বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের জন্য বিশ্ব জনমতকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে ১ আগস্ট লন্ডনের ট্রাফলগার। স্কোয়ারে এক বিরাট জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এই অনুষ্ঠানে ব্রিটেনের বিভিন্ন এলাকা থেকে ২০ হাজারেরও বেশি বাঙালি। যােগ দেয়। ৬. বিবিসির ভূমিকা : বাংলাদেশের স্বাধীনতার খবর ফলাও করে প্রচার শুরু করে বিবিসি। ২৭ মার্চ বিবিসির। প্রভাতী অধিবেশনে বঙ্গবন্ধুর ঘােষণাটি প্রচারিত হয়। এরপর থেকে মুক্তিযুদ্ধ, হানাদার বাহিনীর বর্বরতা ও অন্যান্য খবরাখবর প্রচারিত হতে থাকে। বিবিসির সাংবাদিক মার্ক টালির প্রতিবেদন শােনার জন্য মানুষ উন্মুখ হয়ে থাকত। বিবিসি। বঙ্গবন্ধুর ঘােষণা, বিদ্রোহ দমনে কামান ব্যবহার, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণ, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র গঠন, ঢাকা ও। অন্যত্র খাদ্য সংকট, মুজিবনগর সরকারের দেশে-বিদেশে কার্যক্রম, মুক্তিবাহিনীর বীরত্ব, পাকবাহিনীর পরাজয়, বঙ্গবন্ধুর। গােপনে বিচার বন্ধ প্রভৃতি সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ ও অনুষ্ঠান প্রচারের মাধ্যমে স্বাধীনতা যুদ্ধে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে।। ৭. বহির্বিশ্বের অন্যান্য পত্র-পত্রিকার ভূমিকা : বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সমর্থনে উল্লিখিত প্রচার। মাধ্যম ছাড়াও গুরুত্ব সহকারে সংবাদ প্রকাশ করে; “দি নিউ স্টেটম্যান’, দি ইভনিং স্টার (ওয়াশিংটন), নিউ টাইমস। (মস্কো), দি গার্ডিয়ান (ইংল্যান্ড), দি অবজারভার (ইংল্যান্ড), ‘উতুসান’ (মালয়েশিয়া), নিউ নেশন’ (সিঙ্গাপুর), “দি। জাপান টাইমস, মুসলমান’ (ভারত), রাইজিং নেপাল’ (নেপাল), সাপ্তাহিক গৌরব (ভারত), “সাপ্তাহিক পয়গাম’, “দিগুনাইদিন’ (তুরস্ক), “দি আফগান মিলাত’, ডেইলি টাইমস’, (কানাডা), ‘আল সাহাফা’ (সুদান), থাই মেরি, ‘দি টাইম’। (ম্যাগাজিন) ইত্যাদি। উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণার ফলে বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠন করা সম্ভব হয়। সারা দুনিয়ার রাষ্ট্র ও মানুষ এতে বিক্ষুব্ধ হয় এবং রাষ্ট্রসমূহ বাংলাদেশের পক্ষ নিতে থাকে। আর জনগণও বাংলাদেশের পক্ষে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করে। যার ফলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম অনেকটা সহজ হয়ে পড়ে। মাত্র ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বাংলাদেশ অর্জন করে স্বাধীনতা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *