নারী জাগরণ সম্পর্কিত কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকসেনারা এদেশীয় দোসর রাজাকার, আল-বদর, আলশামস-এর সহায়তায় অনেক মুক্তিযােদ্ধা ও মুক্তিযােদ্ধার পরিবার, আত্মীয়-স্বজনকে ধরে নিয়ে গিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের। হাতে তুলে দেয় অথবা নিজেরা তাদেরকে হত্যা করে।। মুক্তিযুদ্ধে নারী নির্যাতন : পাক হানাদার বাহিনী এদেশের মানুষের প্রতি প্রতিশোধ নিতে নারীদেরকে টার্গেট করে। তারা নারীদের উপর নির্যাতন করতে তাদের এদেশীয় দোসরদের সহায়তা নেয়। বিভিন্নভাবে তারা এদেশের। নারীসমাজের উপর ঝাপিয়ে পড়ে। যুদ্ধের ময়দানে জয়লাভ করতে না পেরে তারা নারী নির্যাতনের মতাে বিকৃত পথ বেছে  নেয়।

মুক্তিযুদ্ধে নারী নির্যাতনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিম্নে তুলে ধরা হলাে

নারী ধর্ষণ : পাকসেনা ও তাদের এদেশীয় দোসরদের প্রধান লক্ষ্য ছিল এদেশের নারীদের যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণ। করা। সেই সময়ে কিশােরী বা তরুণীদের তারা জোর করে তাদের ক্যাম্পে তুলে নিয়ে গিয়ে বন্দী করে রেখে অমানবিকভাবে যৌন নির্যাতন চালাত। তাদের হাত থেকে মধ্যবয়সী এমনকি বৃদ্ধা পর্যন্ত রক্ষা পায় নি। তারা এতটাই অমানবিক কাজ করতাে। যে, মায়ের সামনে মেয়েকে ধর্ষণ, স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে ধর্ষণ, ভাইয়ের সামনে বােনকে ধর্ষণ করতাে। ২. নারীদের গুলি করে হত্যা : যেসব নারীর উপর তারা যৌন নির্যাতন চালাত তাদের খুব কম সংখ্যককে তারা বাচিয়ে রাখত।

যৌন নির্যাতনের পর বেশির ভাগ নারীকে তারা গুলি করে হত্যা করতাে।। ৩. নারীদের গর্ভপাত ঘটানাে ; অমানবিকভাবে যৌন নির্যাতনের ফলে অনেক নারী গর্ভবতী হয়ে পড়ে ।। পাকসেনারা সেসব গর্ভবতী নারীর জোর করে গর্ভপাত ঘটাত। এক্ষেত্রে তারা কোনাে ডাক্তারি পদ্ধতি অনুসরণ করতাে না।। যার ফলে অনেক নারীর মৃত্যু পর্যন্ত ঘটত। | মুক্তিযুদ্ধে শরণার্থী সমস্যা : পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়ে। অনেক বাঙালি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও মায়ানমারে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ করে। সে সময়ে প্রায় এক কোটি শরণার্থী। ভারতে এবং অসংখ্য মুক্তিযুদ্ধের সংগঠন, মুক্তিযােদ্ধা ও সাধারণ মানুষ মায়ানমারে আশ্রয় গ্রহণ করে।

এদেশের নাগরিক। শরণার্থী শিবিরে অবস্থান করার ফলে নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয় যেগুলাের কিছু অংশ নিম্নে আলােচনা করা হলাে : ১. স্থানীয় ও সরকারি চাপ : প্রথম পর্যায়ে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও মায়ানমারের স্থানীয় জনগণ ও সরকার। বাংলাদেশের শরণার্থীদের আশ্রয় দিতে চায় নি, তারা নানাভাবে চাপ প্রয়ােগ করতে থাকে, যাতে বাঙালিরা নিজ দেশে ফিরে যায়। বাংলাদেশের সর্বত্র যুদ্ধ ও সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচার, নির্যাতনের ভয়ে শরণার্থী মানুষগুলাে ভারত ও | মায়ানমারের চাপ সত্ত্বেও সেখানে অবস্থান করে। ২. আবাসন ও খাদ্য সমস্যা । পরবর্তীকালে ভারত ও মায়ানমার সরকার বাঙালিদের শরণার্থী হিসেবে। আশ্রয়দান করলেও পর্যাপ্ত আবাসন ব্যবস্থা ও খাদ্যের সংস্থান করে নি। আবাসন ও খাদ্য সমস্যার ফলে বাঙালি শিবিরে। অনেকে নানা ধরনের সমস্যায় পড়ে।

অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে জীবনযাপন এবং অপর্যাপ্ত ও অপুষ্টিকর খাদ্য খেয়ে অনেকে । অসুস্থ হয়ে পড়ে। * ৩. ভারত ও মায়ানমারের শর্ত প্রদান : বাঙালি শরণার্থী শিবির ভারত ও মায়ানমারে আশ্রয় গ্রহণ করায় এই দুই দেশ আলাদাভাবে শরণার্থীদের উপর শর্ত প্রদান করে। ভারত শর্ত প্রদান করে যে, বাংলাদেশের যুদ্ধ শেষে অবশ্যই ১৯৭২ সালের জানুয়ারির মধ্যে তাদের নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। আর মায়ানমার সরকার শর্ত প্রদান। করে যে, বাঙালিরা শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ করতে পারবে, তবে কোনাে প্রকার যুদ্ধের পরিকল্পনা বা কার্যক্রম। পরিচালনা করতে পারবে না। তাদের সাধারণ শরণার্থী হিসেবে থাকতে হবে। উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা নিরীহ বাঙালিদের উপর নানারকম দমন-নিপীড়ন চালায়। তারা নির্মমভাবে সাধারণ বাঙালিদের হত্যা করে, নারীদের উপর পাশবিক নির্যাতন চালায়।

যার ফলে লাখ লাখ বাঙালি শরণার্থী হিসেবে ভারত ও মায়ানমারে

আশ্রয় গ্রহণ করে এবং অমানবিক জীবনযাপন করে।। | ১৩ প্রশ্ন : ৯,১২। গণহত্যা কি? খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর গণহত্যা সম্পর্কে যা । জান লিখ। অথবা, খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর গণহত্যা সম্পর্কে লিখ। উত্তর : ভূমিকা : পাকিস্তানি শাসকগােষ্ঠী পূর্ববাংলা তথা বাংলাদেশের মানুষকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে এক নির্মম গণহত্যা চালায় যা মানবিকতায় অকল্পনীয়। পাকিস্তানি বাহিনী ২৫ মার্চ কালরাত্রে নিরীহ, নিরস্ত্র, ঘুমন্ত মানুষকে হত্যার মধ্য দিয়ে এদেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। । ।

| মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণ : ১০ এপ্রিল, ১৯৭১ সালে মুজিবনগর সরকার গঠিত হলেও মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় ১৭ এপ্রিল, ১৯৭১ সালে। মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলায় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার শপথ গ্রহণ করে। মুজিবনগর সরকারের শপথ পাঠ করান অধ্যাপক ইউসুফ আলী এমএনএ । শেখ। মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলার প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। শেখ মুজিবুর রহমানের অবর্তমানে সৈয়দ নজরুল ইসলাম। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। মুজিবনগর সরকারের গঠন : তৎকালীন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ১৯৭১ সালের ২০ অক্টোবর গণপ্রজাতনী বাংলাদেশ সরকারের সংগঠন এবং কার্যাবলির উপর একটি প্রতিবেদন পেশ করেন। সে প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, মুজিবনগর সরকারকে ১২টি মন্ত্রণালয়ে সংগঠিত করা হয়েছিল।

মন্ত্রণালয়ের বাইরে আরাে ৫টি সংস্থা ছিল

যারা সরাসরি মন্ত্রিপরিষদের কর্তৃত্বাধীনে কাজ করতাে। স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে মুজিবনগর সরকারের প্রধান কার্যালয় কলকাতার থিয়েটার রােডে স্থাপন করা হয়। মুজিবনগর সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কে নিম্নে বিস্তারিত আলােচনা করা হলাে : * ১. প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ স্বয়ং। মন্ত্রণালয়ের প্রধান ও মূল অঙ্গ সংস্থা ছিল সশস্ত্র বাহিনীর দপ্তর। সশস্ত্র বাহিনীর দপ্তরে ছিলেন প্রধান সেনাপতি কর্নেল ওসমানী, সেনাপ্রধান লে. কর্নেল রব, উপসেনাপ্রধান ও বিমানবাহিনী প্রধান এ কে খন্দকার এবং বিভিন্ন ব্যাংকের স্টাফ অফিসার। বাংলাদেশের সমস্ত যুদ্ধাঞ্চলকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করা হয়। পরবর্তীকালে ৩টি ব্রিগেড গঠন করে এস ফোর্স, জেড ফোর্স ও কে ফোর্স নামকরণ করা হয়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় : মুজিবনগর সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন খন্দকার মােশতাক আহমেদ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কলকাতা, দিল্লি, লন্ডন, ওয়াশিংটন, নিউইয়র্ক ও স্টকহােমে মিশন স্থাপন করে। জাতিসংঘে প্রতিনিধি প্রেরণ করা। হয়। বাংলাদেশী নাগরিক এবং সহানুভূতিশীল ব্যক্তিবর্গ কর্তৃক যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, সুইডেন, জাপান ও অন্যান্য কতিপয় দেশের সমর্থন লাভের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা চালানাে হয়। বাংলাদেশের বিশেষ দূত হিসেবে বিচারপতি আবু সাইদ চৌধুরী ব্রিটেনে কূটনৈতিক তৎপরতা চালান এবং প্রবাসী বাঙালিদের সংঘবদ্ধ করে আন্দোলন ও জনমত গড়ে তােলেন। | ৩. অর্থ, শিল্প এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় : মুজিবনগর সরকারের অর্থমন্ত্রী ছিলেন এম. মনসুর আলী। মুজিবনগর সরকারের পূর্ণাঙ্গ বাজেট ছিল। এ বাজেটে শুধু সরকারের নয়, বিভিন্ন দফতর, অঙ্গ প্রতিষ্ঠান, জোনাল অফিস, যুব ক্যাম্প, শরণার্থী, বেতার, প্রচারণা ইত্যাদির ব্যয় নির্বাহের ব্যবস্থা ছিল। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে একটি বাণিজ্য বাের্ড গঠন করা হয়।

এ বাের্ড শুধু আয়ের উৎস হিসেবেই নয়; বরং বাংলাদেশের আর্থিকভাবে টিকে থাকার জন্য বিদেশে পণ্য রপ্তানির বিভিন্ন উৎস অনুসন্ধান করে। ৪. স্বাস্থ্য ও কল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রাথমিকভাবে একজন মহাপরিচালকের অধীনে এ বিভাগ গঠন করা। হয়েছিল। পরবর্তীতে মহাপরিচালককে সরকারের সচিবের পদমর্যাদা প্রদান করা হয়। এ বিভাগের কার্যাবলি, সেনাবাহিনীর। জন্য চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং বেসরকারি চিকিৎসা সেবা দুটি পৃথক ক্যাটাগরির অধীনে সংগঠিত করা হয়। বিভিন্ন সংস্থা থেকে অনুদান হিসেবে ওষুধ ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি সংগ্রহ এবং রিকুইজিশনের ভিত্তিতে বিভিন্ন সেক্টরে সেগুলাে পাঠানাের ‘ দায়িত্ব ছিল স্বাস্থ্য বিভাগের। * ৫. স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় । মুজিবনগর সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন এ. এইচ এম কামরুজ্জামান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জোনাল এডমিনিস্ট্রেটিভ কাউন্সিলসমূহের দায়িত্ব পালন করেন। তথ্য সংগ্রহ ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার নিকট। সেগুলাে প্রেরণ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রধান কাজ ছিল। । ৬. মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয় মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং তার অধীনে অতি অল্পসংখ্যক কর্মকর্তার সমন্বয়ে | সচিবালয় গঠন করা হয়েছিল। মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয়ের দায়িত্ব ছিল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি মন্ত্রিপরিষদের সভায় পেশ করা, | সিদ্ধান্তসমূহ লিপিবদ্ধ ও বিতরণ করা এবং বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণ করা। । ৭. তথ্য ও বেতার, মন্ত্রণালয় : স্বাধীন বাংলা বেতার সরকারের অধীন সর্বপ্রথম সংস্থাসমূহের অন্যতম। প্রাথমিক অবস্থায় আব্দুল মান্নান এমএনএ-এর সরাসরি তত্ত্বাবধানে বেতার কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। কালিগঞ্জ সার্কুলার

রােডের বাড়িতে অনুষ্ঠান ধারণ করা হতাে

তবে, তা প্রক্ষেপণ করা হতাে ৩৯ সুন্দরী মােহন স্ট্রিটের আটতলা বাড়ির ছাদের উপর থেকে। মিডিয়াম ওয়েভ ৩৬১.৪৪ মিটার ব্যান্ডে প্রতি সেকেন্ডে ৮৩০ কিলাে সাইকেলে ভেসে আসত ব্যথা বাংলা বেতার কেন্দ্রের আহ্বান। ৮. সাধারণ প্রশাসন। সাধারণ প্রশাসন বিভাগে একজন পূর্ণ সচিব নিয়ােজিত ছিলেন। তিনি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর অধীনে কাজ করেন। এ বিভাগ সরকারের সকল সংস্থাপন বিষয়ক কাজের দায়িত্ব পালন করে। আঞ্চলিক পর্যায়ের ১ম ও ২ শ্রেণীর পদসমূহ পূরণ, অফিসসমূহের বাজেট অনুমােদন ইত্যাদিও সাধারণ প্রশাসন বিভাগের দায়িত্ব ছিল। ৯. প্রাণ ও পুনর্বাসন বিভাগ : এটি রিলিফ কমিশনের অধীনে সংগঠিত যিনি সরাসরি স্বরাষ্ট্র ও ত্রাণমন্ত্রীর অ কাজ করেন। ত্রাণের জন্য গৃহীত বিভিন্ন প্রকার আবেদনপত্রসমূহ নিখুঁতভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বিশেষ ক্ষেত্রে বাংলাদে নাগরিকদের সাহায্য করে এ বিভাগ। এ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ শিক্ষকমণ্ডলীর রিফিলের ব্যবস্থাও করেছে।

আরো পড়ুন:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *