আমাদের জন্মভূমি আমরা সবাই ভালোবাসি – মাতৃভূমি সম্পর্কে আলোচনা

স্বীকৃতি প্রদান দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে আরাে জোরদার করে তােলে। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে সােভিয়েত রাশিয়া ভারতে। অবস্থানরত বাংলাদেশীদের ও অর্থ এবং অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সাহায্য করে। স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশের বিধ্বস্ত। যােগাযােগ ব্যবস্থার উন্নয়নে সােভিয়েত রাশিয়া প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করে। | উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, মস্কো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একেবারে শেষ পর্যায় ব্যতীত কখনােই খােলাখুলি সমর্থন জানায় নি। তারা চেয়েছিল পাকিস্তান কাঠামাের মধ্যে এ সংকটের রাজনৈতিক সমাধান। পাকিস্তানের সমালােচনা করলেও মস্কো কখনই দেশটির বিরােধিতা করে নি। তবে তাদের মধ্যে দোদুল্যমানতা থাকলেও তারা। গণহত্যার বিরুদ্ধে ও বাঙালির ন্যায়সঙ্গত দাবির পক্ষে ছিল ।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যুক্তরাজ্যের ভূমিকা উল্লেখ কর। অথবা, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে ব্রিটের ভূমিকা সংক্ষেপে লিখ। | উত্তর : ভূমিকা : ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ হলাে বাঙালি জাতির দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের চূড়ান্ত অধ্যায়। বস্তুত। এ আন্দোলন ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের, শােষকের বিরুদ্ধে শােষিতের এবং জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের আন্দোলন। আর বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অবশেষে বাংলার বীর জনতা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে বিশ্বের । দরবারে স্বাধীন সার্বভৌম জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

মাতৃভূমি সম্পর্কে আলোচনা

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ব্রিটেনের ভুমিকা : ব্রিটিশ সরকার অত্যন্ত সুচতুর নিরপেক্ষ নীতি অবলম্বন করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে। তথাপি ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ও রাজনৈতিক দলসমূহ এ সংকটে সােচ্চার হয়ে উঠেন। তাদের উল্লেখযােগ্য ভূমিকা হচ্ছে গণহত্যা বন্ধ, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর, বাংলাদেশকে স্বীকৃতির জন্য। সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি, বাঙালিদের সভা সমাবেশে যােগদান, যুদ্ধ বিরতি ঘােষণা করে ৩০০ জন সদস্য কর্তৃক প্রস্তাব পাস, শরণার্থীদের জন্য বর্ধিত সাহায্য প্রদান, সরকার কর্তৃক সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের উল্লেখ, সর্বদলীয় সংসদীয় । দলের ভারত ও বাংলাদেশ সফর, পাকিস্তান সরকারের পরিবর্তে জাতিসংঘের মাধ্যমে বাংলাদেশে ত্রাণ বিতরণের আহব্বান, ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের ঘােষণা প্রভৃতি।

পার্লামেন্টের বিরােধী ও সরকারি দলের সদস্যদে

তবে পার্লামেন্টের বিরােধী ও সরকারি দলের সদস্যদের সােচ্চার ভূমিকার কারনে পাকিস্তানের পক্ষের সমর্থকদের বক্তব্য ম্লান হয়ে যায়। ব্রিটিশ পত্র-পত্রিকা ও গণমাধ্যম বিশেষত ডেইলি টেলিগ্রাম, টাইমস, অবজারভার, গাডিয়ান, বিবিসি, প্রভৃতি বাংলাদেশের পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালায়। বহু। বেসরকারী সংস্থা, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, লেখক, রাজনীতিবিদ প্রমুখ বাংলাদেশের পক্ষে কাজ করেন। সে সময় পার্লামেন্টে। সদস্য ডগলাসের নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘জাস্টিস ফর ইস্ট বেঙ্গল’। এছাড়াও, ৬ আগস্ট, ১৯৭১ ব্রিটিশ সংসদে সাবেক মন্ত্রী। জন স্টোনহাউস আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির জন্য চাপ দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড। হিথকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলােচনা করার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, “শেখ মুজিবকে মুক্তি দিলে পূর্ব পাকিস্তানের একটি রাজনৈতিক মীমাংসায় পৌছানাে সম্ভব হবে।”

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ব্রিটেনের নীতি ছিল স্থিতাবস্থা বজায়। রাখা। ভারতে আশ্রয় গ্রহণকারী বাঙালিদের ব্রিটিশ সরকার যে আন্তর্জাতিক ত্রাণ তৎপরতায় অংশগ্রহণ করেন তার। পিছনে পাকিস্তান সরকারের সম্মতি ছিল। ব্রিটেনের পত্র পত্রিকায় মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে প্রচার অব্যাহত ছিল তাতে সরকার। কোনােরূপ হস্তক্ষেপ করেনি। ৩০ প্রশ্ন : ৪০। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে চীনের ভূমিকা উল্লেখ কর। অথবা, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে চীনের ভূমিকা সংক্ষেপে লিখ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গণচীন শুরু থেকে পাকিস্তানকে সমর্থন দিয়ে কট্টর পাকিস্তান ঘেঁষা নীতি। অবলম্বন করে। যা স্বাধীনতাপ্রিয় বাঙালি বিশেষ করে বামপন্থীদের জন্য গভীর হতাশা সৃষ্টি করে। চীন চায় নি যে পাকিস্তানের মতাে একটি মিত্রদেশ দুর্বল হয়ে পড়ুক বা চীনের আচরণে পাকিস্তান খুব ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ক।

আবার উভয় দেশের অভিন্ন শত্রু ভারত সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বাংলাদেশ সংকট নিরসনে উৎসাহিত হােক চীন এও চায় নি। | বাংলাদেশর স্বাধীনতা যুদ্ধে চীনের ভূমিকা : ২৫ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যার পর চীন এ সম্পর্কে কোন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে নি। কিন্তু চীনা সংবাদসংস্থা New China News Agency ৪ এপ্রিল এমন একটি সংবাদ পরিবেশন করে যে, পূর্ব পাকিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের স্তব্ধ করার উদ্দেশ্যে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ১১ই এপ্রিল চীন প্রথম সরকারি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। ঐদিন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল আগা মােহাম্মদ ইয়াহিয়া খানকে দেওয়া এক পত্রের মাধ্যমে চৈনিক প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই পাকিস্তানে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে এবং

কিস্তানের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বাধীনতা রক্ষায় চীন সরকার ও জনগণের সকল সময় সমর্থনের আশ্বাস দেন। সালাদেশের মুক্তিযুদ্ধে চীন পাকিস্তানে প্রচুর অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম প্রেরণ করেন। সামরিক বাহিনীর জন্য প্রেরিত ব্যাপক চীনা সামরিক সরঞ্জাম জাহাজ থেকে খালাস করার বিষয়েও বেইজিং আপত্তি জেলে নি। একাত্তরের গ্রীষ্মকাল থেকে নিয়মিত পশ্চিম পাকিস্তান সীমান্ত দিয়ে চীন সমরাস্ত্র পাঠাত। এছাড়াও গেরিলা যুদ্ধে। প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য চীন অক্টোবর মাসে ঢাকায় দু’শ সামরিক বিশেষজ্ঞকে পাঠিয়ে ছিল।

১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন। হলে চীন এক বিবৃতিতে ‘তথাকথিত বাংলাদেশ সৃষ্টির জন্য রুশ-ভারতের তীব্র সমালােচনা করে। | উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে চীন শুরু থেকেই পাকিস্তানকে সমর্থন করেছে। চীন। চায় নি যে পাকিস্তানের মতাে একটি মিত্রদেশ দুর্বল হয়ে পড়ক বা চীনের আচরণে পাকিস্তান খুব ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ক। ৩০ প্রশ্ন : ৪১। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা সংক্ষেপে লিখ। অথবা, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা কি ছিল? অথবা, মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান সম্পর্কে লিখ। সৈয়দ আহম্মদ বিশ্ববিদ্যালয় ক. সুখানপুকুর, বগুড়া, নি, প.-‘১৫]। উত্তর : ভূমিকা : বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত অত্যন্ত ইতিবাচক ও দায়িত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন

প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন বিভিন্ন প্রকার সাহায্য-সহযােগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতায় ভারত অবদান। রাখে। যুদ্ধের কারণে দেশত্যাগী উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দান, সশস্ত্র সংগ্রামীদের প্রশিক্ষণে সহায়তা, অস্ত্র ও সামরিক সাহায্য প্রদান। সর্বোপরি প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতায় ভারত ব্যাপক ভূমিকা রাখে | বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরােক্ষ সহায়তার জন্য ভারত বাংলাদেশের উপর একটি স্থায়ী প্রভাব বিস্তার করে আছে।। | বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা : বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত প্রত্যক্ষ ও পরােক্ষভাবে বিভিন্ন। প্রকার সাহায্য-সহযােগিতা প্রদানের মাধ্যমে অত্যন্ত দায়িত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের। ভূমিকা সম্পর্কে নিম্নে আলােচনা করা হলাে :

উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দান : পাক-হানাদারদের অতর্কিত আক্রমণে বাংলার মানুষ অত্যন্ত সংকটময় পরিস্থিতির। শিকার হয়। হাজার হাজার নারী-পুরুষ জীবনরক্ষার জন্য বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়। ফলে তারা আশ্রয়হীন উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়। অনেকে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে চলে যায়। এ সংকটকালীন মুহূর্তে ভারত সরকার আশ্রয়হীন মানুষগুলােকে আশ্রয়। দেয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দান করে ভারত অত্যন্ত মহৎ ভূমিকা পালন করে। ২. গেরিলাদের প্রশিক্ষণে সহায়তা : পাক সেনাদের বর্বর হত্যাযজ্ঞের কারণে দেশের কোথাও নিরাপত্তা ছিল না । অসহায় জনগণকে রক্ষা এবং পাকবাহিনীকে বিতাড়িত করতে সর্বসাধারণ অস্ত্র হাতে তুলে নেয়। কিন্তু তাদের কোনাে প্রশিক্ষণ। ছিল না। তাই দেশের অভ্যন্তরে ভয়ানক ধ্বংসলীলা বিরাজমান থাকায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্রভাবে গেরিলা ইউনিট করে অনেক দলকে ভারতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। ভারত সরকার গেরিলাদের প্রশিক্ষণে যথেষ্ট সাহায্য-সহযােগিতা করে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বীকৃতি দান

অস্ত্র সাহায্য ; পাক হানাদারদের প্রতিহত করতে মুক্তিযােদ্ধাগণ প্রতিরােধ বৃহ গড়ে তােলেন। কিন্তু। পাকবাহিনী ছিল আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত। তাই মুক্তিযােদ্ধাদের পর্যাপ্ত অস্ত্রের প্রয়ােজনীয়তা দেখা দেয়। এ পরিস্থিতিতে। ভারত মুক্তিযােদ্ধাদের নিকট অস্ত্র সরবরাহ করে সহযােগিতা করে। ৪. বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বীকৃতি দান : বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের অব্যাহত প্রচেষ্টার প্রেক্ষাপটে এবং বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহে ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দ্রিরা গান্ধী বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে আকৃতি প্রদান করেন। ভারতের এ স্বীকৃতি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

৫. বাংলাদেশের সপক্ষে বিশ্ব জনমত গঠন : পাক সেনাদের নির্মম আক্রমণে বাংলাদেশের মানুষের জীবন। দুর্বিষহ হয়ে উঠে। এ করুণ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে প্রত্যক্ষ সাহায্য-সহযােগিতা করা ছাড়াও ভারত সরকার। বাংলাদেশের উদ্ভত সমস্যা সমাধানের জন্য বিশ্বের সকল দেশের কাছে আবেদন জানিয়েছে। । ৬. প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অংশগ্রহণ : বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত শুধু সমর্থন দান এবং পরােক্ষভাবে সাহায্যসহযােগিতাই করে নি, সংগ্রামেও ভারত অংশগ্রহণ করেছিল। নভেম্বর মাসে মুক্তিযােদ্ধাদের পরিচালিত বেলুনিয়া। অভিযানের সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ আরম্ভ। এরপর ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বিমান বাহিনী ভারতীয় বিমান।

যটি আক্রমণ করলে ভারত প্রত্যক্ষভাবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর থেকে বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনী যৌথভাবে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়তে থাকে। | উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারত অনন্য ভূমিকা। পালন করে। প্রত্যক্ষ ও পরােক্ষ সাহায্য-সহযােগিতা দান ছাড়াও শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ ভারত। মধ্যস্থতা করে। এতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের সাথে ভারতের সহযােগিতার কথাও ইতিহাসে স্থান পায়।

আরো পড়ুন:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *